নিথর দেহকে ছয় টুকরা করেন আব্দুর রহমান

লাশ ৬ টুকরা করে রেখে মসজিদে নামাজ পড়ান রহমান

একই সঙ্গে রাতের খাবার খান মো. আজাহার (৩০) এবং মাওলানা আব্দুর রহমান। এরপর কথা কাটাকাটি হয় তাদের। একপর্যায়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে মেরে ফেলা হয় আজাহারকে। এরপর তার নিথর দেহ বড় ছুরি দিয়ে ছয় টুকরা করেন আব্দুর রহমান। সেপটিক ট্যাঙ্কে টুকরাগুলো ঢুকিয়ে সিমেন্ট দিয়ে ঢালাই করেন। কক্ষের রক্ত পরিষ্কার করে গোসল করেন। ওজু করে মসজিদে ফজরের নামাজও পড়ান তিনি। এরপরও তিনি টানা ছয় দিন একেবারে স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন।

কোনো সিনেমার গল্প বা হাল আমলের মেগা সিরিয়ালের কাহিনি নয়। গত ১৯ মে রাতে রাজধানীর দক্ষিণখানে স্থানীয় সরদারবাড়ি জামে মসজিদে ইমামের কক্ষে এভাবেই খুন ও গুম হন আজাহার। খুনে জড়িত মাওলানা আব্দুর রহমান (৫৪) ওই মসজিদের ইমাম ও খতিব হিসেবে ৩৩ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। সোমবার রাতে তাকে গ্রেপ্তারের পর মঙ্গলবার সকালে মসজিদের সেপটিক ট্যাঙ্ক থেকে আজাহারের লাশের টুকরাগুলো উদ্ধার করে র‌্যাব। পেশায় গার্মেন্টকর্মী আজাহার ১৯ মে থেকে নিখোঁজ ছিলেন।

র‌্যাব ও পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, নিহত আজাহারের স্ত্রীর সঙ্গে আব্দুর রহমানের অনৈতিক সম্পর্ক ছিল বলে আজাহার সন্দেহ করতেন। বিষয়টি ‘মীমাংসা’ করতে ওই রাতে তিনি আব্দুর রহমানের কাছে যান। দু’জন রাতে একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করলেও ঘটনাটি নিয়ে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি ও ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে আবদুর রহমান তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যা ও লাশ গুমের কথা স্বীকার করলেও অনৈতিক সম্পর্কের কথা অস্বীকার করেছেন তিনি।

আজাহারের লাশ উদ্ধার ও আব্দুর রহমানকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়ে মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর কারওয়ানবাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করেন সংস্থার কর্মকর্তারা। সেখানে র‌্যাব-১-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. আব্দুল মোত্তাকিম বলেন, তারা গোপন খবরের ভিত্তিতে জানতে পারেন, সরদার বাড়ি জামে মসজিদের সিঁড়িতে রক্তের দাগ রয়েছে এবং সেপটিক ট্যাঙ্ক থেকে দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে। এরপর তারা ছায়া তদন্ত শুরু করলে এলাকাবাসীর কাছ থেকে জানতে পারেন, মো. আজাহার ১৯ মে বিকেল থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। তদন্তের একপর্যায়ে মসজিদটির ইমাম আব্দুর রহমানকে গ্রেপ্তার করলে তিনি আজাহারকে খুন ও টুকরা করে লাশ গুমের কথা স্বীকার করেন। তার দেখানো মতে লাশের ছয়টি টুকরা উদ্ধার করা হয়।

এই নৃশংস খুনের কারণ সম্পর্কে র‌্যাব অধিনায়ক বলেন, নিহত আজাহারের ৪ বছর বয়সী ছেলে ওই ইমামের কাছে মক্তবে পড়ত। আজাহার নিজেও তার কাছে কোরআন শিক্ষা নিয়েছেন। এভাবে ইমামের সঙ্গে আজাহারের পরিবারের ঘনিষ্ঠতা হওয়ায় তিনি মাঝেমধ্যে ওই বাসায় যেতেন। ঈদের ছুটিতে আজাহার স্ত্রী-সন্তান নিয়ে টাঙ্গাইলে গ্রামের বাড়ি যান। স্ত্রী-সন্তানকে বাড়ি রেখে ১৯ মে ঢাকায় ফিরে আজাহার মসজিদে পূর্বপরিচিত ইমামের কাছে যান। সেখানে তাদের সঙ্গে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে হত্যাকাণ্ড ঘটে। হত্যায় ব্যবহৃত তিনটি ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনার সময় মসজিদে ইমাম আব্দুর রহমান ছাড়া আর কেউ ছিলেন না।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে লে. কর্নেল মুত্তাকিম বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার আব্দুর রহমান জানিয়েছেন, স্ত্রীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে বলে আজাহার তাকে সন্দেহ করতেন। যদিও তাদের মধ্যে সম্পর্ক ছিল না। এটা নিয়ে তাদের কথা কাটাকাটি হয়। ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি খুন করেন। বিষয়টি জানতে নিহত আজাহারের স্ত্রীর বক্তব্যও নেওয়া হবে।

র‌্যাবের অপর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, খুনের পর দেহ ছয় টুকরো করে তা গুমের পর আব্দুর রহমান যখন ফজরের নামাজ পড়ান, তখন তার ভুল হচ্ছিল। মসজিদের মুয়াজ্জিন মো. জুবায়েরকে উদ্বৃত করে ওই কর্মকর্তা বলেন, ইমাম সাধারণত নামাজে ভুল করেন না। ২০ মে ফজর নামাজের সময় দুইবার ভুল করেন। এর পর শুদ্ধভাবে নামাজ পড়ান। তাকে তখন বেশ অস্থির মনে হচ্ছিল। তবে বিষয়টি কেউই বুঝতে পারেননি।

যা বলছেন আব্দুর রহমান: আব্দুর রহমান র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে দাবি করেছেন, সন্দেহবশত আজাহারই ওই রাতে তাকে খুন করতে ছুরি নিয়ে এসেছিলেন। এশার নামাজের পর তারা একসঙ্গে খাবার শেষ করেন। এর পর তাকে মারার চেষ্টার সময় বাধা দিলে ধস্তাধস্তিতে আজাহার পড়ে যান। তখন তার ছুরি দিয়েই গলার ডানপাশে আঘাত করলে তিনি সেখানেই মারা যান। এর পর লাশ কী করবেন, তা নিয়ে তিনি চিন্তায় পড়ে যান। পরে তার কাছে থাকা কোরবানির গরু জবাইয়ের বড় দুটি ছুরি বের করে দেহ কেটে ছয়টি টুকরো করেন। ভোরে মুয়াজ্জিন আজান দিতে মসজিদে আসার আগেই লাশের টুকরোগুলো সেপটিক ট্যাংকে ঢুকিয়ে দেন। তার কক্ষের পাশেই নির্মাণাধীন মসজিদের সিমেন্ট ছিল। পরে সেই সিমেন্ট দিয়ে সেপটিক ট্যাংকের মুখ বন্ধ করে দেন। ঘটনার পর থেকে তিনি ভয়ে মসজিদে নিজের কক্ষে না থেকে পাশের একটি মাদ্রাসায় থাকছিলেন।

আজাহারের প্রতিবেশী ও স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, আজাহারের স্ত্রীই ছেলেকে মসজিদের মক্তবে আনা-নেওয়া করতেন। তখন ইমামের সঙ্গে দেখা ও কথা হতো। এক পর্যায়ে ছেলের জন্য পানিপড়া, রোগমুক্তির তাবিজ দেওয়ার কথা বলে ইমাম আব্দুর রহমানও নিয়মিত আজাহারের বাসায় যেতেন। তাদের আচরণও সন্দেহজনক মনে হয়েছে।

একজন প্রতিবেশী জানিয়েছেন, বিষয়টি টের পেয়ে আজাহার তার বাসা বদল করেন। এর পরও তারা সম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছিলেন। পরে ঈদে স্ত্রী-সন্তানকে গ্রামে নিয়ে যান। শিশু ছেলের কাছ থেকেও মায়ের সন্দেহজনক আচরণের কথা আজাহার জানতে পেরেছিলেন।



Source link

admin

Read Previous

৪২তম বিসিএসে ২ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি

Read Next

বিধি-নিষেধ অমান্য করায় আটক ৫৫৫