রোজিনা ইসলামের নিঃশর্ত মুক্তি চাই

রোজিনার অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানিয়েছেন তাঁর সহকর্মীরা

প্রথম আলোর সিনিয়র রিপোর্টার রোজিনা ইসলামের অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানিয়েছেন তাঁর সহকর্মীরা। রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহার এবং তাঁকে অপদস্থকারীদের তদন্ত ও দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনারও দাবি জানান তাঁরা। রোজিনা ইসলামের নামে করা মামলা নিঃশর্তভাবে প্রত্যাহার এবং তাঁর মুক্তির দাবি জানান প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আনিসুল হক। তিনি বলেন, ‘এটি আইনি প্রক্রিয়ার বাইরেও হতে পারে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও হতে পারে। আজ রিমান্ডের আবেদন না করলে আমরা রোজিনার জামিনও পেতে পারতাম। একজন নাগরিক হিসেবে আমরা মনে করি, রোজিনার বিরুদ্ধে করা মামলাটি মিথ্যা মামলা। রোজিনা ইসলামের নিঃশর্ত মুক্তি চাই, তাঁর বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহার চাই এবং তাঁকে অপদস্থকারীদের তদন্ত ও দায়ীদের বিচার চাই।

প্রথম আলোর সিনিয়র রিপোর্টার রোজিনা ইসলাম স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আক্রোশের শিকার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দুর্নীতির রিপোর্ট করায় তাকে হেনস্থা করা হয়েছে। রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে করা মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করে পুলিশ। পরে বেলা ১১টার একটু পরে রোজিনা ইসলামকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে নেওয়া হয়। ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জসিম তাঁর রিমান্ড নাকচ করেন। রিমান্ড নাকচের পর সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়া হয়েছে। আদালত থেকে কারাগারের নেবার পথে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন তাকে ফাঁসানো হচ্ছে।

সাংবাদিক রোজিনাসলামকে হেনস্তাকারীদের বিচার এবং তাঁর মুক্তির দাবিতে আজ মঙ্গলবার বিকেলে সাড়ে চারটায় মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। এতে প্রথম আলোর সাংবাদিক, বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত কর্মীরা অংশ নেন। মানববন্ধনে বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিক, সাংবাদিক সংগঠনের নেতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, উন্নয়নকর্মীরা অংশ নিয়ে সংহতি প্রকাশ করেন। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি মুরসালিন নোমানী বলেন, রোজিনা ইসলামের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে থামাতে পরিকল্পিতভাবে সাজানো নাটক করা হয়েছে। রোজিনা ইসলামের এই ঘটনা সরকার ও সাংবাদিকদের মুখোমুখি দাঁড় করানোর অপচেষ্টা কি না, সেটি তদন্ত করার দাবি জানান তিনি।

সচিবালয়ে কর্তব্য পালন করতে গিয়ে প্রায় ৬ ঘণ্টা হেনস্তার পর প্রথম আলোর সিনিয়র সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে থানায় সোপর্দ, মামলা দায়ের, সারা রাত থানায় রাখা, আদালতে পাঠিয়ে রিমান্ডের আবেদন, জামিন না দিয়ে কারাগারে পাঠানোর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ, ক্ষোভ, নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে সম্পাদক পরিষদ। আজ মঙ্গলবার সম্পাদক পরিষদের এক বিবৃতিতে এ কথা বলা হয়। জাতীয় প্রেসক্লাব সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন বলেন সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে সচিবালয়ে আটকে রেখে লাঞ্ছিত ও হেনস্তা করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন তার ওপর আঘাত মানে আমাদের ওপর আঘাত করা হয়। আজ মঙ্গলবার (১৮ মে) দুপুরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন। এ সময় জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান উপস্থিত ছিলেন। ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে স্পষ্ট করে বলেছি, তল্লাশীর নামে তাকে হেনস্তা করা হয়েছে। আমরা এর বিচার চাই।’

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও গুরুত্ব পেয়েছে রোজিনা ইসলামকে গ্রেপ্তারের খবর। রোজিনা ইসলামকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় সংবাদ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। ওয়াশিংটন পোস্ট, আল জাজিরা, দ্য হিন্দু, স্ট্রেইটস টাইমস, এবিসি নিউজ, বার্তা সংস্থা এএফপিসহ বেশ কিছু সংবাদমাধ্যম গুরুত্বের সঙ্গে এই সংবাদ প্রকাশ করেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে দুর্নীতি নিয়ে প্রতিবেদন করে পরিচিতি পাওয়া একজন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঔপনিবেশিক আমলের ‘অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’ লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-এপির বরাত দিয়ে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে ওয়াশিংটন পোস্ট।

এদিকে সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে নিপীড়নের নিন্দা ও প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠেছে সারা দেশ। বিনোদন অঙ্গনের তারকারাও ঘৃণ্য এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। পরিচালক থেকে অভিনয়শিল্পী, সুরকার থেকে কণ্ঠশিল্পীরা কঠোর শব্দ-বাক্যে নিন্দা জানিয়েছেন। অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী লিখেছেন, ‘করোনার কারণে আমরা যে মুখোশ পরা শুরু করেছি, সেই অভ্যাসটা থাকুক। কিন্তু আসুন, আসল মুখোশটা খুলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াই। দৃপ্ত কণ্ঠে আওয়াজ তুলি, “রোজিনা ইসলামের মুক্তি চাই”।’

অভিনেত্রী জয়া আহসান লিখেছেন, ‘রোজিনা সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালন করতে গিয়েছিলেন, সিঁধ কাটতে নয়। দেখতে পেলাম হেনস্তার শিকার হয়ে তিনি মাটিতে পড়ে যাচ্ছেন। এই আমাদের আচরণ! এই আমাদের সভ্যতা! রোজিনার গলার ওপর চেপে বসা আঙুলগুলো গভীর অর্থময় এক প্রতীকের মতো লাগছে। মনে হচ্ছে, আঙুলগুলো কোনো ব্যক্তির গলায় নয়, বরং বাংলাদেশের বাক্‌স্বাধীনতার কণ্ঠনালিতে চেপে বসেছে।

চলচ্চিত্র পরিচালক মোস্তফা সরয়ার ফারুকী লিখেছেন, ‘কালকের ঘটনাটার মাঝে একধরনের মাস্তানির ভাব আছে! সাংবাদিক সমাজের উচিত এই বাড়াবাড়ি বা মাস্তানির ঘটনায় যারা জড়িত, তাদের সবার বিচার নিশ্চিত করতে সোচ্চার থাকা এবং রুটিন করে আগামী এক মাস স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সব পর্যায়ের দুর্নীতি নিয়ে আরও বেশি বেশি রিপোর্ট করা! যা তারা থামাতে চেয়েছে, তাকেই আরও জ্বালিয়ে দেওয়াই হবে আসল উত্তর!’

এদিকে প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলা ও তাঁকে নিপীড়নের প্রতিবাদে বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী সাংবাদিকেরা স্বেচ্ছায় কারাবরণের আবেদন নিয়ে শাহবাগ থানায় অবস্থান নিয়েছেন। সাংবাদিকেরা বলছেন, রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে যে ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে, সেই একই অভিযোগ যেকোনো অনুসন্ধানী সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আনা যায়। সে কারণে রোজিনা ইসলামকে কথিত যে দোষে দোষী বলে অভিযুক্ত করা হচ্ছে, এমন অসংখ্য অভিযোগ থানায় উপস্থিত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেও আনা যায়। কারণ অনুসন্ধানী সাংবাদিকেরা জনস্বার্থে এমন গোপন নথির মাধ্যমে দুর্নীতি উন্মোচন করে থাকেন। তাই তাঁরা স্বেচ্ছায় কারাবরণের আবেদন নিয়ে থানায় হাজির হয়েছেন।

প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের মুক্তির দাবি জানিয়েছে বিক্ষুব্ধ সাংবাদিক সমাজ। তাঁর মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন গণমাধ্যমকর্মীদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা। আজ মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাব এবং ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সামনে পৃথক মানববন্ধনে তাঁরা এ কর্মসূচির কথা জানান। এদিকে সাংবাদিক রোজিনার মুক্তির দাবিতে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএসআরএফ। প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রোজিনা ইসলামকে হেনস্তা ও তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগে মামলা করার প্রতিবাদে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএসআরএফ) আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে গণমাধ্যম কেন্দ্রে জরুরি সভা করেছে। এর আগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংবাদ সম্মেলন বর্জন করে সংগঠনটি। সভায় সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়—রোজিনা ইসলামের নিঃশর্ত মুক্তি, মামলা প্রত্যাহার ও লাঞ্ছিত করা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে আগামীকাল বুধবার বেলা ১১টা থেকে দপুর ১২টা পর্যন্ত জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধনের আয়োজন করা হবে। তাঁর জামিন না হওয়া পর্যন্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সব ধরনের ব্রিফিং বর্জন করা হবে। এ ছাড়া সভায় সিদ্ধান্ত হয়, সাংবাদিকদের মূল সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণার পাশাপাশি রোজিনা ইসলামের মুক্তির দাবিতে তথ্যমন্ত্রীকে স্মারকলিপি দেওয়া হবে।

উল্লেখ্য পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য গতকাল সোমবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে গেলে রোজিনা ইসলামকে সেখানে পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় আটকে রেখে হেনস্তা করা হয়। একপর্যায়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাত সাড়ে আটটার দিকে তাঁকে শাহবাগ থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। রাত পৌনে ১২টার দিকে পুলিশ জানায়, রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে মামলা হয়েছে। তাঁকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী



Source link

admin

Read Previous

শার্শায় ক্লিনিক থেকে নবজাতক চুরি

Read Next

কীটনাশক খেয়ে মা-ছেলের আত্মহত্যা