শুক্রবার, এপ্রিল ৪, ২০২৫

ঢাবিতে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর উৎসবের স্বীকৃতি: সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের পথে অগ্রযাত্রা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৮ মার্চ, ২০২৫, ০৪:০৩ পিএম

ঢাবিতে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর উৎসবের স্বীকৃতি: সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের পথে অগ্রযাত্রা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছিলেন যে, তাদের প্রধান সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব সাংক্রান-চাংক্রান-বিহু-বিষু-বৈসু-সাংগ্রাই-বিঝুর সময়  পরীক্ষা বন্ধ রাখা হোক। অবশেষে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ১২-১৬ এপ্রিল এই উৎসব উপলক্ষে পরীক্ষা গ্রহণ না করার ঘোষণা করেছে।

১৭ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তর থেকে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় যে,শিক্ষার্থীদের আবেদনের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগ ও ইনস্টিটিউটসমূহে পরীক্ষা গ্রহণ  কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ও অন্যান্য আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা পরিবারের সঙ্গে নির্বিঘ্নে তাদের সবচেয়ে বড় উৎসব উদযাপন করতে পারবেন।

সাংক্রান-চাংক্রান-বিহু-বিষু-বৈসু-সাংগ্রাই-বিঝু হলো পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোর ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ উৎসব। চাকমারা বিজু, মারমারা সাংগ্রাই, ত্রিপুরারা বৈসু নামে এই উৎসব পালন করে। সাধারণত চৈত্রের শেষ দুই দিন ও বৈশাখের প্রথম দিন এই উৎসব উদযাপিত হয়। বিজু উৎসবে চাকমারা বুদ্ধমূর্তি স্নান, দীপ প্রজ্বালন, ধর্মীয় প্রার্থনা ও ঐতিহ্যবাহী গজ্যাপজ্যা পালন করে। মারমারা সাংগ্রাই উৎসবে বুদ্ধের স্নান ও জলকেলি উৎসব আয়োজন করে। ত্রিপুরারা বৈসুতে গুরুজনদের গোসল করিয়ে আশীর্বাদ গ্রহণ করে এবং ঐতিহ্যবাহী গরয়া নৃত্য পরিবেশন করে। এটি শুধু আনন্দ উদযাপনের মাধ্যম নয়, বরং পারিবারিক ও সামাজিক সংহতির গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।

আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের এই দাবি দীর্ঘদিনের। ২০২২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগে আয়োজিত এক বিক্ষোভ মিছিলে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী  জাতিগোষ্ঠীর ছাত্র সংগঠনগুলো অংশ নেয়। তখন পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) নেতা সতেজ চাকমা সংহতি বক্তব্য রাখেন। তবে সেসময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। পরবর্তীতে আদিবাসী শিক্ষার্থীরা পুনরায় এই দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়ন তাদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি দেয়।

২ মার্চ ২০২৫ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জুম্ম শিক্ষার্থী পরিবারের প্রতিনিধিরা উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করে উৎসবকালীন সময়ে পরীক্ষা না রাখার দাবি জানান। উপাচার্য তাদের আশ্বস্ত করেন যে অন্তত এই দিনগুলোতে কোনো পরীক্ষা রাখা হবে না। পরে ৬ মার্চ ডিনস কমিটির সভায় এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয় এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর চেয়ারম্যান ও ইনস্টিটিউট পরিচালককে বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্তে আনন্দ প্রকাশ করেছেন আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা। লবিয়ত চাকমা নামে একজন শিক্ষার্থী বলেন, "আগে আমরা আমাদের উৎসবগুলো সঠিকভাবে পালন করতে পারিনি।উৎসবের সময় পরীক্ষার চাপে কখনো ঢাকায় থাকতে হয়েছে।  প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত আমাদের জন্য স্বস্তির। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানাই।"

বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষার্থীরাও মনে করছেন, এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। তারা আশা করছেন, ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য নীতিতেও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে।

এদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমতলের আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর প্রধান সামাজিক উৎসব উপলক্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচ দিনের ছুটি ঘোষণার দাবি জানিয়েছে শিক্ষার্থীরা। ১১ মার্চ দুপুরে তারা উপাচার্য ড. সালেহ হাসান নকীবের কাছে স্মারকলিপি দেন।

শিক্ষার্থীদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকলে উৎসব উপলক্ষে পর্যাপ্ত ছুটি দেওয়া উচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ও যদি এই দাবির প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখায়, তাহলে এটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি প্রণয়নের দৃষ্টান্ত হবে।