#কাউন্সিলরের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে চাপ প্রয়োগ সচিবদের
# নেতাকর্মীদের হস্তক্ষেপে নাগরিক সেবা কঠিন হয়ে উঠেছে
স্থানীয় সরকারের অন্যতম অনুষঙ্গ রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন হিসেবে পরিচিত এ দুই সিটি করপোরেশানের তৃণমূলের জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করেন নির্বাচিত কাউন্সিলররা। তবে গণঅভ্যূত্থানের পর পালিয়ে গেছেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলররা। কাউন্সিলরবিহীন এ জায়গা এখন দখল নিয়েছে স্থানীয় ওয়ার্ড বিএনপির-নেতা-কর্মীরা। একই সাথে এসব অফিসে সচিবদের দাপ্তরিক কাজে নানানরকম প্রভাব বিস্তারও করছেন তারা। স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মী, ওয়ার্ড সচিব, কাউন্সিলর কার্যালয় সরেজমিন পরিদর্শন করে এসব তথ্য জানা যায়। আজকের বাংলার অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সরেজমিনে পরিদর্শন করে ও সচিবদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ৫ আগস্টের পর থেকে ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের অফিসগুলোতে বিএনপির ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা কর্মীদের আনা গোনা শুরু হয়। তখন থেকে ওয়ার্ড সচিবদের দাপ্তরিক কাজে নানা রকম প্রভাব বিস্তার করে তারা। সচিবদেরকে জোর করা হচ্ছে কাজের দায়িত্ব তাদেরকে বুঝিয়ে দিতে। কাউন্সিলররা যেসব কাজ করতেন সেসব কাজ বন্টন ও তদারকির দায়িত্বও পালন করছেন তারা। জন্ম সনদ, মৃত্যুসনদ সংক্রান্ত সেবা দিতে গিয়েও অফিসের কর্মকর্তারা ধমক খাচ্ছেন স্থানীয় নেতা-কর্মীদের।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩৪ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর অফিসে নিয়মিত বসেন ডালিম হোসেন। তিনি ৩৪ নং ওয়ার্ড বিএনপির সদস্য সচিব। কাউন্সিলর অফিসে বসার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রতিদিন তিনি কাউন্সিলর অফিসে বসেন। প্রতিদিন দুপুর ২টা থেকে ৫টা পর্যন্ত এবং সন্ধ্যার পর থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কাউন্সিলর অফিসে থাকেন তিনি।
ওই অফিসের কর্মকর্তারা বলেন, ডালিম সাহেব এখানকার অঘোষিত কাউন্সিলর হয়ে উঠেছেন। উনার কথা ছাড়া কোন কাজ করা যায় না। সবসময় এসে তদারকি করেন তিনি। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন থেকে শুরু করে সব ধরনের কাজে তিনি হস্তক্ষেপ করতে থাকেন। বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় তাদের।
কাউন্সিলর অফিসের খোঁজ নিতে অন্তত ৪০ জন ওয়ার্ড সচিবের সাথে কথা হয় আজকের বাংলার প্রতিবেদকদের। ওয়ার্ড সচিবরা জানান, বিএনপির নেতা-কর্মীদের কারণে স্বাভাবিক কাজ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা এখানে এসে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী কাজ করতে জোর-জবরদস্তি করতে থাকে। তাদের কথা মতো কাজ না হলে হেনস্তার শিকার হতে হয়। টিসিবির কার্ড থেকে শুরু করে সব কাজই তারা করে থাকেন।
নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে সচিবরা তাদের নাম প্রকাশে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছেন। গতকাল দুপুর বারটায় দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৫০ নম্বর ওয়ার্ড অফিস কাযালয়ে উপস্থিত হন দুই প্রতিবেদক। সেখানকার কর্মচারীরা জানান, এখানে বিএনপির লোকজন এসে বসে থাকে। একটু আগে আসলেও ওনাদের দেখা পাওয়া যেত। টিসিবি কার্ড আমাদের হাতে নেই, এই কার্ড উনারাই বন্টন করে। ওনারা আমাদের সব কাজে বাধাগ্রস্থ করে, ধমকের উপর রাখে।
অধ্বস্তন কর্মকর্তারা স্বীকার করলে এমন পরিস্থিতির কথা অস্বীকার করেন অঞ্চল-৫ এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা সাখাওয়াত হোসেন। তিনি আজকের বাংলাকে বলেন, অফিসিয়াল কাজ ঠিকঠাকভাবে চলছে। এ ধরনের কোন অভিযোগ আমার কাছে আসেনি।
এমন পরিস্থিতিকে সহযোগীতার পরিস্থিতি বলে বর্ণনা করেছেন ৫৮ নম্বর ওয়ার্ড সচিব জাহাঙ্গীর বলেন, আমাদের এখানে সবাই আসে। আমরা সবাইকে সহযোগীতা করি। কেউ আমাদের উপর প্রভাব বিস্তার করছে না। বিএনপির লোকজন নিজ দায়িত্বে এসে আমাদেরকে কাজ করে দিচ্ছেন। নিজেরাই টিসিবির কার্ড বিতরণ করছেন।
দক্ষিণ সিটি করপোরেশানের ৫৯নং ওয়ার্ডের ওয়ার্ড সচিব আল আমিন বলেন, আমি ৫৯নং ওয়ার্ডে একা কাজ করি। কর্মচারী সংকটের কারণে স্থানীয় বিএনপি নেতারা আমাদেরকে নানাভাবে সহযোগীতা করছে। বিশেষ করে টিসিবির কার্ড বিতরণে।
নাম না প্রকাশ করার শর্তে ৫৮ নং ওয়ার্ডের এক বাসিন্দা জানান, ‘এখানে বিএনপি নেতারা যা বলেন তাই হয়। এক পরিবারে ২টি টিসিবি কার্ডও পায়, আর আমরা গরীব মানুষরা কিছু পাইনা।’
৬০ নাম্বার ওয়ার্ড সচিব ফকরুল ইসলাম জানান, কেউ আমাদের অফিস দখলে নেয়নি। স্থানীয় সবাই এখানে আসে। বিএনপির নেতা-কর্মীরা আসে দুই-চারটা টিসিবি কার্ডের সুপারিশ নিয়ে। জামায়াতের নেতা-কর্মীরাও দু’একজন আসে। তারা সুপারিশ করলে আমরা কাজ করে দেই। ওরাতো গরীব মানুষ।
অঞ্চল-১০ ও ৮ এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা আক্তার উননেছা শিউলী বলেন, ‘আমার অধীন ৬৯নং ওয়ার্ডে এ নিয়ে কিছুদিন আগে একটু ঝামেলা হয়েছিলো, আমরা এটাকে সমাধান করেছি।’ কাউন্সিলর অফিসগুলোতে প্রভাব বিস্তার করছে কিনা জানতে চাইলে কিছুটা রাখঢাক রেখে বলেন, বোঝেনইতো ১৬ বছর ক্ষমতার বাইরে ছিলো। ওনারাতো একটু প্রভাব রাখতে চাইবেই। তবে ওনারা আমাদের সচিবদের কাজে সহযোগীতা করছে। আর টিসিবি কার্ড ডিলার এবং সচিব ছাড়া কারো বন্টন করার এখতিয়ার নেই।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের চিত্রও একই। বেশিরভাগ সচিবরা প্রভাব বিস্তারের কথা স্বীকার করেছেন। তবে তারা কেউ নাম প্রকাশ করতে ইচ্ছুক নয়। অঞ্চল-২ এর একজন ওয়ার্ড সচিব জানান, বিএনপির নেতাকর্মীদের অহেতুক হস্তক্ষেপের জন্য নাগরিকদের সেবা দেয়াই মুশকিল হয়ে গেছে। টিসিবি কার্ড নিয়ে বেশির ভাগ ঝামেলা হচ্ছে। এসব কার্ড এখতিয়ার সচিবদের হলেও উনারা ইচ্ছেমতো কার্ড বিলি করবে বলে ধমক দিচ্ছে। ৮ হাজারের বেশী কার্ড ইস্যু ছিলো। ওখান থেকে একই পরিবারে একাধিক কার্ড নেয়ার অভিযোগে অনেক কার্ড বাতিল হয়। সেক্ষেত্রে কিছু নতুন প্রায় ৩ হাজারের মত কার্ড ইস্যু হওয়ার প্রক্রিয়া চালু হয়। এক্ষেত্রে বিএনপির নেতাকর্মীদের হস্তক্ষেপ কাজের ব্যাঘাত ঘটায়।
অঞ্চল-৪ এর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, নেতাকর্মীরা নিজেরাই মানুষের কাছ থেকে কার্ড দিবে বলে তথ্য নিয়ে রেখেছে। মানুষ কার্ডের জন্য এসে আমাদের পেরেশানি দিচ্ছে। পাশাপাশি বিএনপি নেতাকর্মীও এসে তাদের চাহিদা মাফিক কার্ড দাবি করছে। এরকম হস্তক্ষেপ করলে প্রকৃত প্রাপ্ত ব্যক্তিরা তাদের কার্ড নেয়া থেকে প্রায়ই বঞ্চিত হয়।
এমন পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ আজকের বাংলাকে বলেন, উত্তর সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর অফিসগুলোর দখল নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো গুরুতর অভিযোগ পাইনি। কিছু কথা শুনতে পেয়েছি। তবে অভিযোগ পাওয়া মাত্রই আমরা দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।