যোবায়ের হোসেন জাকির প্রকাশিত: ৩০ মার্চ, ২০২৫, ০৮:০৩ পিএম
ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ। পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ছুটি হয়েছে ক্যাম্পাস। প্রিয়জনদের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে নাড়ীর টানে বাড়ি ফিরছে শিক্ষার্থীরা। সবুজ শ্যামল ক্যাম্পাসে নেই প্রাণচাঞ্চল্য। স্থবিরতা নেমে এসেছে চারদিকে। নেই রিকশার টুংটাং বেলের শব্দ। গাড়ির হর্ণের বিরক্তিকর শব্দ আপাতত বন্ধ হয়েছে। নেই চিরচেনা কোলাহল।
শহীদ মিনার চত্বরে শিক্ষার্থীদের জটলাও চোখে পড়ছে না। ক্যাফেটেরিয়া, লাইব্রেরিতেও কাউকে দেখা যাচ্ছে না। চিরযৌবনা ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) যেন মলিন হয়ে আছে। আবাসিক হলগুলোর ক্যান্টিন-ডাইনিং এ তালা ঝুলছে। বটতলার দোকানীরা তাদের দোকানের শাটার নামিয়ে কবেই বাড়ি ফিরেছে। রেইনট্রি গাছে শুধু কাকেদের ডাক শোনা যায়। খাবার না পেয়ে ক্যাম্পাসের কুকুর বিড়ালগুলো যেন পাশের এলাকায় চলে গেছে।
জাবি সাংবাদিক সমিতির অফিসটায় যেন ধুলোর আস্তরণ জমে গেছে। কলা অনুষদ, সমাজবিজ্ঞান অনুষদের সামনে বসে পায়চারী করছেন দুই-তিন জন নিরাপত্তারক্ষী। বিশ্ববিদ্যালয়ের মুল ফটকে কয়েকটি রিকশা দেখা যাচ্ছে যাত্রীর আশায়।
বলছিলাম জাঁকজমকের রাজধানী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা। ইতিহাস ঐতিহ্য আর সংস্কৃতিতে ভরপুর এই বিশ্ববিদ্যালয়টি বছরের অন্যান্য সময়ে শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত থাকলেও ঈদের ছুটিতে জনমানবহীন হয়ে পড়েছে।
ক্যাম্পাস ছুটি হয়েছে গত ২০শে মার্চ। ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে গেছে ক্যাম্পাস। যারা টিউশনি করান বা কোন কোচিং-এ ক্লাস নেন অথবা অন্য কোন পার্ট টাইম জবের সাথে যুক্ত তাদের অনেকেই এখনো বাড়ি ফিরতে পারেনি। কেউ বা যাবেন চাঁদ রাতে আবার কেউবা থেকে যাবেন ক্যাম্পাসেই। যারা বাড়ি ফিরবেন তাই ব্যাগ গুছিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিয়েছেন ইতিমধ্যেই।
চাঁদ রাতে বাড়ি ফিরতে চাওয়া চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী রাজিব মিয়া বলেন, ক্যাম্পাস কয়েকদিন আগে ছুটি হলেও বাড়ি যেতে পারিনি। আমার দুইটা টিউশন। এসএসসি পরীক্ষার্থী একজন আছে। ঈদের পর পরীক্ষা তার। তাই অভিভাবকের অনুরোধে একটু বাড়তি সময় দিতে হয়েছে। তাছাড়া এখনো টিউশন ফিও দেয়নি। তাই চাঁদ রাতে বাড়ি ফিরবো।
কেউবা চাকুরীর পরিক্ষা দেবেন, কেউবা গবেষণায় ব্যস্ত। কারো আবার ঈদ পরেই ফাইনাল পরীক্ষা। অনেকেই বিসিএস এর জন্য রাতদিন এক করে নিজেকে শপে দিয়েছেন। তাই তারা বাড়ি ফেরার কথা ভুলেই গিয়েছেন। হয়তোবা এবারের ঈদ টা ক্যাম্পাসেই করবেন।
মাস্টার্সের শিক্ষার্থী রবিন হায়দার বলেন, এবার ঈদে বাড়ি যাবো না। ঈদের কয়েকদিন পরেই একটা চাকুরির পরিক্ষা আছে। প্রতিবারই তো বাড়িতে ঈদ করি। জীবিকার তাগিদে এবার না হয় ক্যাম্পাসেই ঈদ করলাম।
এবারের ঈদে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের জীবনে নিয়ে এসেছে ভিন্ন রকমের এক অভিজ্ঞতা। দীর্ঘদিনের একাডেমিক ক্লান্তি পেরিয়ে দীর্ঘ ষোল দিনের ছুটিতে বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সাথে ঈদ করার আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
তাদের কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, এবারের রমজানেই প্রথমবারের মতো বাড়ির বাইরে অবস্থান করেছেন তারা। রাতে সেহরির সময় সাময়িক অসুবিধা হলেও দারুণ অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে এবারের রমজানে।
প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী লিয়ন সরকার মুঠোফোনে বলেন, ক্যাম্পাস বন্ধ হওয়ার পরদিনই বাসায় চলে আসছি। কি যে আনন্দ লাগছে বলে বোঝাতে পারবো না। দীর্ঘদিন ক্লাস পরীক্ষা দিয়ে বাড়িতে আসার সময় যেন মনে হচ্ছিল জগতের সকল সুখ আমার কাছে ধরা দিয়েছে।
ক্যাম্পাসের কোলাহলমুক্ত পরিবেশ যেমন একদিকে বলছে নগরীতে ঈদের আমেজ স্পষ্ট হয়ে উঠছে অন্যদিকে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তারক্ষীদের জীবন যেন বিষন্নতায় ঘিরে ধরেছে। শিক্ষার্থীরা তাদের একাডেমিক ক্লান্তি শেষে একটু সজীবতার পরশ পেতে গ্রামে ফিরছে। কিন্তু নিরাপত্তাকর্মীদের আর গ্রামে ফেরা হয়নি। ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা রক্ষার্থে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পরিবেশ সমুন্নত রাখার তাগিদে তারা তাদের ঈদের আনন্দকে বিসর্জন দিয়েছেন। কাজ করে যাচ্ছেন নিরলসভাবে।
ক্যাম্পাসের হাজারো শিক্ষার্থী, শতশত শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী যখন বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সাথে ঈদ করছে তখন ফাঁকা ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা দেওয়ার গুরুভার নিজেদের কাঁধেই তুলে নিয়েছেন নিরাপত্তাকর্মীরা।
ক্যাম্পাসের নিরাপত্তারক্ষী রমজান মিয়া বলেন, আপনারা যেমন এই ক্যাম্পাসকে ভালোবাসেন তেমনি আমরাও ভালোবাসি। নিজের বাড়ির মতো মনে হয় এখানে। তাই ঈদে পরিবারের কাছে যাওয়ার জন্য মন ব্যাকুল হয়ে উঠলেও আর যাওয়া হয়নি। তবুও ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক এটাই চাই।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় যেন শুধু একটি নামেই সীমাবদ্ধ নয়। এখানের …